হিন্দি সংস্কৃতির প্রভাবে বদলে যাচ্ছে তরুণদের রুচিবোধ
হিন্দি
সংস্কৃতির করাল গ্রাসে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের রুচিবোধ আর
জীবন যাপন পদ্ধতি। হিন্দি চ্যানেলে প্রচারিত বিভিন্ন সিরিয়ালের বেশির ভাগই
খুবই উদ্ভট, অবাস্তব আর কাল্পনিক কাহিনীতে সাজানো হয়। অধিকাংশ কাহিনীর মূল
উপজীব্য পরকীয়া, শ্যালিকা-দুলাভাইয়ের মাঝে অবৈধ সম্পর্কসহ আরো নানাবিধ
অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে সংসারে সৃষ্ট জটিলতা এবং অশান্তি।
লিভ টুগেদার
এবং বিবাহ বহির্ভূত সন্তানকে সমাজে খুবই সহজভাবে মেনে নেয়া হচ্ছে বলে
উপস্থাপন করা হয়, যা পশ্চিমা সমাজে চলছে। সব সিরিয়ালেরই ঘটনাগুলো উচ্চবিত্ত
সমাজের ড্রয়িং রুমের। ড্রয়িং রুমে বসে পাত্র-পাত্রীরা পরিকল্পনা করে
কিভাবে কার সংসারে আগুন লাগানো যায়। কূটনামি আর ষড়যন্ত্রই হলো অনেক
সিরিয়ালের মূল বিষয়বস্তু। এরকম একটি সিরিয়াল হলো- ‘কাহানি ঘারকি’।
অনেক কাহিনীর সিরিয়াল ১০-১২ বছর ধরে চলছে। কাহিনী কোন দিক থেকে কোন দিকে
যাচ্ছে বুঝা যায় না। অনেক সিরিয়ালের বিষয়বস্তু খুন, সম্ভ্রমহরণ, সম্পত্তি
দখল, পরকীয়া, সংসারে অশান্তি সৃষ্টির নানা কুটকৌশল ইত্যাদি। কয়েকবছর ধরে
চলছে এসব সিরিয়াল। স্টার প্লাস নামক ভারতীয় চ্যানেলের এরকম একটি সিরিয়ালের
নাম ‘সাথিয়া’।
সংসারে নানা কূটকৌশল করে কিভাবে সংসারে আগুন লাগানো
যায়, সংসারে অশান্তি সৃষ্টিতে ঘরের বউদের তৎপরতা, নানা ষড়যন্ত্র ইত্যাদিই
এসব সিরিয়ালের বিষয়বস্তু। এরকম আরেক সিরিয়ালের নাম ‘কিউসি সাঁস ভি বহুথি’।
সিরিয়ালের পোশাক অশ্লীলতায় ভরা। অনেক সময় পোশাক এতোই খোলামেলা থাকে যা
বলার মতো নয়। তাছাড়া প্রায় সময়ই থাকে চরম অশ্লীল দৃশ্য। ইটিভি বাংলায় এরকম
কয়েকটি সিরিয়াল হলো- জয়া, ধুপছায়া, কৃঞ্চকলি, তারেই বলি।
আজ দেশের
অধিকাংশই গৃহিনীদের অবসর সময় কাটে এসব সিরিয়াল দেখে। এসব দেখে দেখে তারা
সংসারে নানা অশান্তি সৃষ্টিতে মেতে উঠে। পরিণামে সুখের সংসারগুলো পরিণত হয়
অশান্তির অগ্নিকুণ্ডে।
ভারতে মুক্তি পাওয়া যেকোনো ছবি সাথে সাথে
এদেশে সিডি এবং ডিভিডিতে নকল আকারে প্রকাশ হয়ে যায়। এছাড়া হিন্দি ছায়াছবির
অশ্লীল গান এবং রিমিক্স গান নির্বাচন করে বিভিন্ন চ্যানেলে দেখানো হয়।
সিডি-ডিভিডি আকারে প্রকাশ করা হয়। এছাড়া প্রায় সব হিন্দি নায়িকার নামে
রয়েছে ছায়াছন্দের সিডি-ডিভিডি।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. এ.আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, হিন্দি
সিনেমা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে যেভাবে অশ্লীলতা ও কামোদ্দীপক বিষয়কে তুলে ধরা
হয় তা হলিউডকেও হার মানায়। হিন্দির অশ্লীলতার তুলনায় হলিউডের বিকিনিপরা
মেয়েদের অনেক শালীন দেখায়।
প্রফেসর মাহবুব আরো বলেন, হিন্দির
মাধ্যমে কামোত্তেজনার আফিম খাইয়ে আমাদের যুব সমাজকে ঘুমিয়ে রাখার এবং অর্থব
বানানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আধিপত্যের বিরুদ্ধে তারা যেন সচেতন না হতে
পারে, কোনো প্রশ্ন করতে না পারে, সেজন্য কামোত্তেজনার আফিম নামক নেশায়
ডুবিয়ে রাখা দরকার। এটি সে পরিকল্পনারই একটি অংশ। হিন্দি চলচ্চিত্রের গান,
পপ আর রিমিক্স গানের অশ্লীলতা পর্নোগ্রাফীর চেয়েও ভয়াবহ।
বিভিন্ন
হিন্দি চ্যানেলে আগে শুধু সিনেমার গান প্রচার করা হতো। এখন বিভিন্ন
কোম্পানি সিনেমার গানের আদলে পপ এবং রিমিক্স গানের ভিডিও, সিডি, ডিভিডি
বাজারে ছাড়ছে। মূলত এগুলোই এখন বেশি প্রচার করা হচ্ছে বিভিন্ন চ্যানেলে।
কারণ এতটাই অশ্লীল যে, হিন্দি চলচ্চিত্রের অশ্লীলতা এখানে তুচ্ছ। হিন্দি
ছবির গান এবং পপ রিমিক্স গানের সিডি-ডিভিডি’র মধ্যে চলছে এখন ভয়াবহ
অশ্লীলতার প্রতিযোগিতা। ফলে সিনেমার গানের অশ্লীলতায় আনা হচ্ছে নিত্য-নতুন
কৌশল।
হিন্দি ছবির গানে অশ্লীলতা আগে ছিল পুরুষ কেন্দ্রিক। অর্থাৎ
নারীদেহ প্রদর্শন করা হতে শুধুমাত্র পুরুষদের আনন্দের জন্য। তবে এখন
নারীদের জন্যও বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নারীদেহের অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির
সাথে এখন পুরুষদের মাধ্যমে চরম অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি দেখানো হয়। সুঠাম দেহের
পুরুষ দিয়ে এখন খালি গায়ে অভিনয় করা হয় নারীদের বিনোদনের জন্য। হিন্দি ছবির
প্রায় নায়ক তাই বডিবিল্ডার।
অনেক অ্যাপার্টমেন্টবাসী তাদের
অভিজ্ঞতায় বলেছে, বিয়ের একটি কমিউনিটি সেন্টারে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান।
বর-কনে উভয় পক্ষের কয়েকশ অথিতির আগমনে ভরে উঠেছে ঘর। ভুরিভোজনের পর অথিতিরা
বিভিন্ন জায়গায় বসে গল্প গুজব, হাসি-তামাশা করছে। হঠাৎ ‘ধুম মাচালে ধুম
মাচালে ধুম’ হিন্দি গানের বিকট শব্দ আর মিউজিকে কেঁপে উঠলো পুরো ঘর। তালে
তালে নাচতে শুরু করলো কয়েকজন তরুণী। সেই সাথে নায়ক-নায়িকার মতো ছেলে-মেয়েরা
উদ্দাম নাচ শুরু করলো। এভাবে উদ্দাম নাচ, গান আর অশালীনতায় কেটে যাবে রাত।
এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বাংলাদেশের শহরে নগরে গ্রামে গঞ্জে সর্বত্র
হিন্দি গান বাজানো ছাড়া এখন আর বিয়ের অনুষ্ঠান কল্পনা করা য়ায় না।
সরকারি অফিস, পিকনিকে আসা যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা, খেলাধুলা,
রান্না-বান্না সবই করছে হিন্দি গানের তালে তালে। গ্রামে, শহরে, উৎসবে,
আনন্দে, বিয়ে-শাদী, জন্মদিন, স্কুল-কলেজের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, মার্কেট,
শপিংমল, অলিগলি, পাড়ায় মহল্লায়, রাস্তার মোড়ে মোড়ে, ভিডিও দোকানে, চায়ের
দোকানে, বাসের ভেতর, লঞ্চের ডেকে সর্বত্রই হিন্দি গান বাজানোর প্রতিযোগিতা।
বেসরকারি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হচ্ছে হিন্দি গানের বিজ্ঞাপন। মোবাইলে
রিং টোনে, বাস ট্রেনে ও লঞ্চের সিটে তরুণ-তরুণী দেখছে হিন্দির গান।
স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি শেষে বাসায় যেতে যেতে ছাত্র-ছাত্রীরা আলোচনা
করছে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দি ছবি নিয়ে। তরুণ-তরুণীদের শোয়ার ঘরে শোভা
পাচ্ছে হিন্দি নায়ক-নায়িকাদের ছবি।
এ দেশের অধিকাংশ বাণিজ্যিক
সিনেমায় ভারতের সিনেমার কাহিনীই শুধু নকল করা হচ্ছে না, গানের সুর, নাচের
মুদ্রা, নায়ক-নায়িকাদের পোশাক- সবই হিন্দির অনুকরণে হচ্ছে। এদেশের সিনেমায়
অশ্লীলতাও এসেছে হিন্দির কুপ্রভাবে। তাই ডিশের অশ্লীলতায় এদেশের মেধাহীন
অর্থলোভী নির্মাতারা সিনেমায় নিয়ে এলো রগরগে নারীদেহের প্রদর্শনী। বিভিন্ন
টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত অনুষ্ঠান, উপস্থাপনার ধরন, বিজ্ঞাপনের ভাষা,
নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান সবই হচ্ছে হিন্দি স্টাইলে।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ড.
আনিসুর রহমান বলেন, এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এখানে সাংস্কৃতিক
নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক অনুশাসন দুর্বল হয়ে যাবে।
যারা এসব হিন্দি অনুষ্ঠান নির্বিচারে দেখে এবং এর প্রতি আসক্ত হয়ে যাচ্ছে,
তাদের মধ্যে লোভ এবং ভোগবাদী চিন্তা-চেতনা বাসা বাঁধতে থাকে। চেষ্টা-সাধনা
সহজে এবং বিনা-পরিশ্রমে গাড়ি-বাড়ি বিত্ত-বৈভব সবকিছু পাওয়ার মানসিকতা গড়ে
উঠে তাদের মধ্যে। ডিশ আছে এমন সব বাসার ছোট ছেলে-মেয়েদের সাথে আলাপ করে
দেখা গেছে, তারা বড়দের অনেক বিষয় সম্পর্কেও বেশ অবগত। হিন্দি বেশি দেখছে
মধ্যবিত্ত শ্রেণী, উচ্চবিত্ত শ্রেণী। আবার ইংরেজি চ্যানেলগুলো বেশি দেখছে।
হিন্দির প্রভাব বেশি পড়ছে শিশু, কিশোর টিনেজার ও যুবকদের মধ্যে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর কামরুল আহসানের মতে,
মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গৃহিনীরা খুব বেশি হিন্দি অনুষ্ঠান দেখে এবং তাদের উপর
এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। তাদের মন মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে,
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কচ্ছেদ পরকীয়া, অশান্তি ইত্যাদি বাসা বাঁধছে
পরিবারগুলোতে।
হিন্দি সংস্কৃতি প্রথমত আমাদের ভারতীয়করণ এবং তারপর
পশ্চিমাকরণ করছে। পার্টি ও পার্লার কালচার বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেয়েদের মধ্যে
ওড়না না পরা এবং প্যান্ট, টি-শার্ট, টাইট সংক্ষিপ্ত পোশাক পরে বাইরে বের
হওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। নাচ-গানের স্কুলে শিশুদের ভিড় বাড়ছে। মদ কালচার
অপরাধ, অপরাধ প্রবণতা ও পারিবারিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। গীবত, পরচর্চা,
কুটনামী শিল্পরূপ পাচ্ছে। ছেলে-মেয়েদের জন্য সময় দেয়ার হার কমছে। ধীরে ধীরে
এগুলো অভ্যাসে রূপ নিচ্ছে। হিন্দি সংস্কৃতিতে প্রভাবিত এখানে একটি নতুন
হাইব্রীড প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। এদের কথা-বার্তা, চাল চলন, পোশাক খাদ্যাভ্যাস
রুচিবোধ সব কিছুই যেন বদলে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
মনোবিজ্ঞান বিভাগের এক প্রফেসর বলেছে, প্রযুক্তির পরিবর্তনটা খুব দ্রুত হয়।
আামদের দেশে খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনেক প্রযুক্তি এসেছে, বিকাশ লাভ করছে।
ফলে নতুন এ প্রজন্মটাও হঠাৎ করে তৈরি হয়েছে এবং উৎকট লাগছে। নতুন প্রজন্মের
এ তরুণ-তরুণীরা কামোত্তেজনা সম্পর্কে খুবই স্বাধীন। বিয়ের আগে দৈহিক
সম্পর্ককে তারা কোনো অপরাধ মনে করে না। হিন্দিতে আসক্ত বিভিন্ন তরুণের সাথে
আলাপ করে দেখা গেছে, তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে দৈহিক সম্পর্কের অভিজ্ঞতা লাভ
করেছে। অনেকে নিয়মিত চর্চা করে বিকৃত কামাচার। হিন্দি খুল্লাম নাচ এবং
সিনেমা দেখা তাদের নেশায় পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা কামোত্তেজনার
সুড়সুড়ি লাভ করে। কামোত্তেজনার সাথে রয়েছে মাদকের সম্পর্ক। ফলে তরুণ সমাজে
মাদকাসক্তিও বাড়ছে।
হিন্দি সংস্কৃতির প্রভাবে তরুণদের মাঝে উৎকট
জীবন ব্যবস্থার একটা নজির দেয়া যায় এভাবে। চট্টগ্রামে একটি অভিজাত ভিডিও
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চার তরুণ একত্রে ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ গানটি
গাইতেছিল। তাদের দুই জনের মাথায় লম্বা চুল পেছনে ঝুটি বাঁধা। এক হাতে দুটি
রিং, বাম হাতের তিনটি আঙ্গুলে তিনটি আংটি। দুই হাতেই দুটি ব্রেসলেট, গলায়
স্বর্ণের চেইন। আরেক জনের মাথায় চুল জেল দিয়ে বিশেষ স্টাইলে কাটা। চারজনেরই
প্যান্ট এমনভাবে নাভীর নীচে যে তা খুলে পরার মতো অবস্থা। চারজনের কানেই
লাগানো আছে ইয়ার ফোন। তারা মুসলমান কিন্তু সব হিন্দি গান তাদের মুখস্ত।
তারা সবাই নিয়মিত হিন্দি চ্যানেল দেখে। তারা সবাই চোস্ত হিন্দি বলতে পারে।
 |
| ক্যাপশন যুক্ত করুন |
